Posts

সৌমিত ভট্টাচার্য্যের গুচ্ছ কবিতা : অসাংসারিক

Image
অসাংসারিক এক এখানে যৌনতা নেই।  দু'খানি পুরনো বাড়ির মতো নিস্পন্দ দু'টি মানুষ  দাঁড়িয়ে আছে পাশাপাশি, বহুদিন  মাঝে গলিপথ... নির্জনতা সেখানে আরও মন্দ্র হয়ে ওঠে  ঘড়ির আয়ু বাড়লে দেখতে পাই– সহজ আতিথ্যে যে সম্পর্কের গাছ বেড়ে উঠেছে আমাদের মাঝে;  একদিন তার ভালোবাসার ছাপোষা ছায়াটুকু  নেমে আসে দু'জনের ছাদে,                                    দু'জনের মাথায়  দুই বিধবার থানের মতো শ্বেতকায়, রাস্তাটির একপাশে  পড়ে আছে আমাদের সদ্যছিন্ন সম্পর্কের দেহ;  নিরস্ত্র, নিথর  আয়ুর জখম থেকে  ভেসে আসে রক্তাভ ঢেউয়ের বানান– অন্যপৃথিবী যাকে, দিয়ে গেছে আলতার নাম  যার ওপর দিয়েই মৃদুপায়ে হেঁটে এলে তুমি, হেঁটে এলে রাস্তাতে পায়ের ছাপ রেখে, আর  অদূরে কোথাও– নতুন বউয়ের সাজে  তোমাকে বরণ করে নিচ্ছে তোমার ভবিষ্যৎ তিন শ্রেষ্ঠতম ভাস্করের দক্ষতায়, তোমার আদলে  পাথর ভেঙে ভেঙে গড়েছি মূর্তিটি।  কাল কেউ এই স্মৃতি নিয়ে যাবে দূরান্তে, সভ্...

সৌমাল্য গরাইয়ের গুচ্ছ কবিতা

Image
জাতিস্মর  পৃথিবীর প্রাচীন লিপিরা  কোনও এক গুহার দেয়ালে, এঁকেছিল জন্মদাগ  মাটির অনেক নীচে তার  পড়েছিল কালো কালো ছোপ  আদিম ইঙ্গিত পেয়ে উন্মীলন কালে  হেলে  পড়া চতুর্থীর চাঁদ হেলে সাপ হয়ে নেমেছিল জলের ভিতর স্বরযন্ত্র হতে যেসব ধ্বনিরা উৎসারিত  স্তব্ধ ছিল তারা একদিন, আকাশের কান্নার মতন ফুটে থাকা নক্ষত্রেরা যে আলোর  চোখ মেলে দিল অন্ধকারে  সুড়ঙ্গ নির্মিত সেই পথে, দিকে দিকে যত দেখি নদী, মাঠ,ছায়া চরাচর বন, পাখি, পড়ে থাকা ছই মনে হয় আমি যেন ইহাদের জাতিস্মর হই.. গর্ভিনী জলের অতলে থাকে শাপলা রঙের মেয়েটি—যেন কালো রঙের একটা ঘরে, অন্ধকারের সাথে তার বসবাস। অন্ধকার চিরকাল বড় একা—  আলো নেই কোনওদিন। দীঘির ভিতর নাগকন্যা ফুল তুলে আনতে গিয়েছিল মেয়ে। রক্তজবা পায়ে, রোদ্দুরের আলতা মেখে ঘাটে পা দিতেই, অপূর্ব একটা দুয়ার খুলে গেল।  জগতের বিশাল দুয়ার— যেন একটা পদ্মযোনি  মা হতে পেল। গর্ভ দিল মেয়েটি। চিরকালীন যে অন্ধকার সে পেল নতুন মা,  ঠিক তখনি একটা প্রজাপতি উড়ে বসলো লাজুক  নোলকে... দীঘির জল সেই প্রথম প্রসব বেদনা অনুভব করল। শালুক ফু...

ভালো থেকো নিশীথ অবশেষ — পর্ব ৪ : জয়দীপ চট্টোপাধ্যায়

Image
প্রশ্নটা শুনে অপ্রতিম কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। ভাবার চেষ্টা করল। টায়রা কিছুটা কাছে এগিয়ে এসে গলা নামিয়ে বলল, ‘অত ভেবে বলবেন না, ভেবে বললে লোকে বানিয়ে উত্তর দেয়!’ নিশাচর প্রাণী শুনে প্রথমেই অপ্রতিমের চোখের সামনে ভেসে উঠল একটা নেকড়ের মুখ। একলা, রাতের অন্ধকারে বিচরণ করা একটা নেকড়ে। কিন্তু নেকড়ে কি বিশেষ ভাবে নিশাচর?– নিশ্চিত হতে পারল না। তারপরই মনে এলো বাদুর আর পেঁচার কথা। সঙ্গে সঙ্গে সেই পেঁচাটা আবার একবার ডেকে উঠল– শিশুর কান্নার মত ককিয়ে ওঠা শব্দ।        ওরা এতক্ষণে হাঁটতে হাঁটতে পুকুরের অন্যপ্রান্তে, যেখান থেকে ওদের রিসর্টটা দেখা যায়। এককালের জমিদার-বাড়ি…এখন পুনর্নির্মিত বিলাসমহল। অপ্রতিম কিছুক্ষণ চেয়ে রইল সেইদিকে। জমিদার-বাড়ির কাঠের খরখরি দেওয়া পাল্লাগুলো একই রকম রাখা আছে। শুধু কাচের আর একটা করে পাল্লা করা, ঘরগুলো বাতানুকূল রাখার জন্য। এখনও কয়েকটা জানলা দিয়ে আলো আসছে, কোথাও হলদেটে, কোথাও মাখন-রঙা আলো। জমিদারবাড়ি, তার জানলা, জানলা থেকে বেরিয়ে আসে নরম মাখন-রঙা আলো– এদের প্রতিবিম্ব টলটল করেছে পুকুরের জলে, যেখানে পানা সরে গেছে। ‘কী সুন্দর ফ্রেম… তাই না?’ টায়রা...

সুমন সাধুর গুচ্ছ কবিতা

Image
কমরেডের আজ দারুণ জ্বর কমরেডের আজ দারুণ জ্বর ইতিহাসের পৃষ্ঠা ওল্টাতে ওল্টাতে দুপুর গড়িয়ে যায় একটা আলুর খোসা ছাড়িয়ে চারটুকরো করা গেল পাশে কাঁহাতক পেঁয়াজের ঝাঁঝ জ্বরের শরীরে হার্ট চলে দ্রুত গতিতে আর দুপুরের অবশ্যম্ভাবী মাস্টারবেশনের পর একটা সিগারেট ধোঁয়া উড়িয়ে বিদ্যুৎ চমকে ওঠে স্নায়ুতে এতকিছু দেখার পর বাড়ি ফিরতে ফিরতে ভাবি কমরেডকে আমি সমর্থন করি না ঘৃণা করি না বরং পরখ করি, যাচাই করি যেভাবে দুই আর দুইয়ের বিয়োগে নির্মিত হয় অদ্ভুত গোলাকার তাকে তীব্রভাবে শূন্যতার দিকে ঠেলে দিই ক্ষণজন্মা যুদ্ধের চারপাশ বড়ো একা পৃথিবী জুড়ে ওড়ে ছাই আগুনের দেখি কী ভীষণ আস্পর্ধা কিশোরীর রক্তে মাছি ভনভন ভনভন আগুন বেড়ে ওঠে গুম মেরে যাওয়া কান্নায় ঝড়েদের যুদ্ধ থাকে না আর উড়ে আসে থকথকে মাটি এই মাটিতেই কঙ্কালসার, ক্ষণজন্মা পৃথিবী যার এক হাতে গোলাপ, আরেক হাতে ধানদুব্বো উপসংহার অধ্যায়ের মাঝখানে জ্বর আসে জ্বরের অস্তিত্ব সোম থেকে শনি — রোববার ছুটির দিন সে আসে না৷ যন্ত্রণা আসে। গালে, ঠোঁটে, বুকে, নাভিতে। জ্বরের ঘোরে শুনি পাড়ার ট্যাপ কল খুলে যাওয়ার চিৎকার। একদিন জল থেমে যায়, ফোঁটা ফোঁটা কপালে পড়ে, অথচ জ্বর— আসছে ত...

আনন্দী চট্টোপাধ্যায়ের দুটি কবিতা

Image
‌চিরহরিৎ  দূর থেকে লক্ষ্য করছি অনেক হারিয়ে যাওয়া আর ফিরে আসার স্মৃতি। মুখবিহীন অজস্র ঝুঁকে-পড়া মানুষ হেঁটে যাচ্ছে, আর রাস্তার মাঝখানে গজিয়ে উঠেছে একটা ফুলগাছ। তুমিও একদিন আমাকে শিখিয়েছিলে, মুঠোয় ধরতে গেলেই ঝরে যায় বালি। এখন পায়ের পাতায়, আর সবুজ শিকড়ে জমা হচ্ছে লাল মাটি, কাঁকর, ধুলো। ফুলগাছের একটা ডাল দেওয়াল ভেদ করে ঢুকে পড়েছে আমার ঘরে, প্রতিদিন একটু একটু করে জড়িয়ে যাচ্ছে চামড়ায়, হাড়ে। চামড়ার ভিতরে সবুজ শিরা ক্রমে স্পষ্ট হয়ে আসছে, টের পাচ্ছি বৃষ্টি ভেজার বাসনা, রোদ গিলে ফেলার ইচ্ছে। খুঁটে তুলছি দেওয়ালের রং, একটা একটা করে ইঁট। নখ ভেঙে, বেরিয়ে আসছে রক্ত, তার রং সবুজ ও সাদা। বন্ধুরা ভয় পাচ্ছে, ভয় পেতে পেতে সরে যাচ্ছে দূরে। মাঝে মাঝে ভেসে আসছে মায়ের চুলের গন্ধ, বাবার বুকের গন্ধ, আমার চোখ বেয়ে গজিয়ে উঠছে শিকড়। শরীর থেকে ঝরে পড়ছে শুকনো পাতা, আমি এগিয়ে চলেছি আরো একটা শীতকালের দিকে। কথা এক একটা শীতকালে আকাশ থেকে সন্ধেবেলার প্রার্থনা শোনা যায়। চারপাশে অজস্র মানুষের নিস্তেজ ভীড়, আমি মন্ত্রমুগ্ধের মতো ফুরিয়ে যাওয়া অস্পষ্ট চিত্রপট খোঁজার চেষ্টা করি। ...

ভালো থেকো নিশীথ অবশেষ — পর্ব ৩ : জয়দীপ চট্টোপাধ্যায়

Image
ভালো থেকো নিশীথ অবশেষ -- ৩য় পর্ব      এখানে আলাদা করে আমন্ত্রণ জানিয়ে কেউ কাউকে ডাকার নেই। ডিনারের টেবিল নেই আলাদা করে, বুফে সাজানোর ব্যবস্থা হচ্ছে মানেই ডিনারের সময় আসন্ন। দু একজন সচেতন মানুষ নিজেরাই প্লেট নিয়ে দুটো স্টার্টার তুলতে এগিয়ে গেছে। কেউ একহাতে বিয়ারের বোতল নিয়েই স্টার্টার তুলে নিয়ে খাওয়া শুরু করে দিয়েছে। দুটো মেয়ে সালাড নিয়ে বসে আছে, ভেজ স্টার্টারের অপেক্ষায়। ওরা ননভেজ খাবে না। টায়রাকে এগিয়ে আসতে দেখে ইচ্ছে করেই প্রাজক্তা গলার স্বর এক ধাপ তুলে বলল ‘ডিনার নেই করনি? কাঁহা গুম হো যাতে হো তুমলোগ!!’ ‘তুমলোগ’-এর মধ্যে টায়রার বন্ধুরা নয়, অপ্রতিম পড়ে– এটা বুঝেই অপ্রতিম তৎক্ষণাৎ উত্তর দিল, ‘আরে প্রাজক্তা… সারা সন্ধে পুল টেবিলে কাটিয়ে দিলে… আমাকে তো দেখতেই পেলে না!’ প্রাজক্তা মারাঠি… বাংলাটা টেনেই বলে। অপ্রতিমকে দেখে এতটুকু অপ্রস্তুত না হয়ে নিজের সপ্রতিভতা বজার রেখেই বলল, ‘আর কী দাদা! আপকে সারি লাইনে টায়রাকে সাথ ভেয়াস্ত থে… আমি বেচারী আর কী করতাম!’ ‘তাহলে এখন চলো… একসাথে কাবাবগুলোর অ্যাকসেপ্টেন্স টেস্ট করি… ডেজার্ট পে চর্চে করি!’, বলে প্রাজক্তাকে একরকম কনুইয়...

আদিদেব মুখোপাধ্যায়ের গুচ্ছ কবিতা

Image
চানঘরে গান রিডাক্স   অসুখী, অন্ধকার আত্মা; চান করার সময় নিজেকে যখন সাবান মাখাস, আবিষ্কার করিস যে কখনোই তুই এগুলো চিনতে পারিস নি! পেট দিয়ে, কোঁকড়ানো চুল দিয়ে চকচকে উরু আর লম্বা চুল দিয়ে ফেনা গড়িয়ে নামে, পায়ের কাছে জমা হয়–অনুগত পোষ্য ওরা, অল্প আঘাতেই সরে যাবে তাই আগে থাকতে কৃপা চাইছে মনিবের কাছে!  দুঃখী, হাড়-জিরজিরে আত্মা নিশ্চিত জানি ভেতরেই তোর বাস ... আঃ! তাও কেন তাকাচ্ছি আয়নার দিকে ? কেন দুজনেই মাথা নাড়ছি, ও আমার দিকে এবং আমি ওর দিকে চেয়ে ভাবছি এমন কোনও ভোর আসেনি বুকের দমবন্ধ পাথর সরিয়ে, কেউ গোর থেকে উঠে এসে বলেনি, "আমি মৃত্যুর পরের খবর জানি ! "  হতভাগা, সাবান মাখানো আত্মা; আমার পেচ্ছাবের জায়গাটা জ্বালা করে উঠছে, আমি ঐ চিড়চিড় ঢেউকে এখনও চিনতে পারি, ছোটো থেকেই ও আমায় ভয় দেখায়, চাপ দিলেই হিরের কুচি এসে পড়বে, ঝকঝক করবে পায়ের কাছে বরাবর জানি ওরা অভিশাপের চিহ্ন।  বিবর্ণ, ছালছাড়ানো আত্মা; রক্ত মুছে মুছে যাবি, নিজের রক্ত বারবার নিজেকেই মুছতে হবে, লোপাট করতে হবে। কুঁকড়ানো, হিংসুটে আত্মা; বাথরুমে মরে পড়ে থাকলে, রক্ত গড়াতে থাকলে, সাবানে র...